বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫০ অপরাহ্ন

ভালুকায় সন্ত্রাস, হানাহানি ও রক্তপাতের অভিযোগে বিএনপি নেতা খোকা ও তার ছেলে রানা বহিষ্কার

ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি:: দলের ভেতরে সন্ত্রাস, হানাহানি ও রক্তপাতের ঘটনায় জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা বিএনপির দুই নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃতরা হলেন, ভালুকা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও জামিরদিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি মো: খোকা মিয়া এবং সাবেক ছাত্রনেতা ও বিএনপি কর্মী তোফায়েল আহমেদ রানা। বহিষ্কৃতরা সম্পর্কে বাবা-ছেলে।

রবিবার (১২ এপ্রিল) দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।

স্থানীয় দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার দুপুরে উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের নারিশের মোড় এলাকায় বাবা ও ছেলের দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ ও কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নিতে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত তিনজন আহত হয়। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সহিংসতার প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় হাই কমান্ড এই কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি ভালুকায় মিল-ফ্যাক্টরির ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ দখলকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের লড়াই গত রোববার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গড়ায়, যেখানে বাবা-ছেলের মধ্যেই গুলির ঘটনা ঘটে এবং অন্তত তিনজন আহত হন।

স্থানীয়দের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষমতার পালাবদলই এ সহিংসতার মূল সূত্রপাত। মিল ফ্যাক্টরীর ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রনকে কেন্দ্র করেই রোববার দুপুরে উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের জামিরদিয়া নারিশ কারখানা এলাকায় বাবা- ছেলের মাঝে মারামারি ও গুলির ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার পর দলের ভেতরে সন্ত্রাস, হানাহানি ও রক্তপাতের ঘটনায় জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগে বাবা খোকা ও তার ছেলে রানাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১১ ভালুকা আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেন উপজেলা বিএনপির আহবায়ক ফখর উদ্দিন আহাম্মদ বাচ্চু। অপরদিকে দলীয় মনোনয়ন না উপজেলা বিএনপির অপর অংশের নেতা উপজেলা বিএনপির আহবায়ক (ভারপ্রাপ্ত) আলহাজ্ব মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্ধীতা করেন। নির্বাচন চলাকালীন সময়েই, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার দায়ে, আলহাজ্ব মুহাম্মদ মোর্শেদ আলমকে ময়মনসিংহ দক্ষিন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও ভালুকা উপজেলা বিএনপির আহবায়ক (ভারপ্রাপ্ত)পদ থেকে বহিস্কার করা হয়। একই সময় একই অপরাধে তার অনুসারী উপজেলা বিএনপি, অংগ ও সহযোগী সংগঠনের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকেও বহিস্কার করা হয়।

নির্বাচনে ফখর উদ্দিন আহাম্মদ বাচ্চু জয়লাভ করেন। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তার সমর্থিত নেতা-কর্মীরা উপজেলার বিভিন্ন মিল-ফ্যাক্টরীতে মুর্শেদ আলমসহ তার গ্রুপের নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রনে থাকা ঝুট ব্যবসা এমপি সমর্থিত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রনে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে। রোববারের ঘটনাটিও ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই ঘটেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামিরদিয়া গ্রামের উপজেলা বিএনপির সদস্য খোকা মিয়া বিএনপির দলীয় প্রার্থী ফখর উদ্দিন আহাম্মদ বাচ্চুর পক্ষে ও তার ছেলে যুবদলকর্মী তোফায়েল আহাম্মেদ রানা বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী আলহাজ মুহাম্মদ মোর্শেদ আলমের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

নির্বাচনের পূর্বে স্থানীয় নারিশ ফ্যাক্টরীর ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রন ছিল ছেলে যুবদলকর্মী তোফায়েল আহাম্মেদ রানার নামে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ওই ব্যবসার নিয়ন্ত্রন চলে যায় বাবা খোকা মিয়ার নামে। এর পর থেকেই বাবা খোকা মিয়া বিভিন্ন লোক মারফত তার ছেলেকে এলাকা ছাড়ার জন্য হুমকি দিয়ে আসছিল। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে খোকা মিয়ার কারণে বাড়ির সামনে নিজের অফিসে বসতে পারছিলেন না ছেলে তোফায়েল আহাম্মেদ রানা। ঘটনার সময় তোফায়েল আহাম্মেদ লোকজন নিয়ে অফিসে বসেন। এ সময় তার বাবা লোকজন নিয়ে অফিস বন্ধ করার নির্দেশ দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে মারামারি এবং একাধিক রাউন্ড গুলির ঘটনা ঘটে।

এছাড়াও নির্বাচনের পর উপজেলার প্রায় বেশীর ভাগ মিল ফ্যাক্টরীর ঝুটের ব্যবসা এমপির সমর্থিত গ্রুপের নিয়ন্ত্রনে চলে এসেছে। যেকটি মিল-ফ্যাক্টরীর নিয়ন্ত্রন নিতে পারেননি, সেগুলোকে কেন্দ্র করেই ঘটছে এসব সহিংসতা। গত ১৬ মার্চ উপজেলা জামিরদিয়া এলাকার এস কিউ ষ্টেশানের “কালার মাস্টার” নামের প্রতিষ্ঠান থেকে মোর্শদে আলমের লোকজন ওয়েষ্ট্রেজের মাল বের করার সময়, খোকা মিয়ার নেতৃত্বে বাধা দেওয়া হয়। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য ইব্রাহিম খলিল বাদী হয়ে গত ১৭ ই মার্চ মোরশেদ আলমসহ ৫০ জন বিএনপির নেতাকর্মীর নামে ভালুকা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সম্প্রতি একই এলাকায় রিদিশা স্পিনিং মিল থেকে মোর্শেদ আলমের লোকজন মাল বের করার সময় উল্লেখিত সংঘবদ্ধ গ্রুপ মিল গেইটে উপস্থিত হয়ে বাঁধা দেয়। আমতলী এলাকার “কটন গ্রুপে” ঝুটের ব্যবসা করতেন হবিরবাড়ি ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি আবু সাঈদ জুয়েল। সম্প্রতি আবু সাঈদ জুয়েলকে বাদ দিয়ে এমপির মনোনীত উপজেলা যুবলীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি কামরুজ্জামান পিন্টুর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সততা এন্টারপ্রাইজকে ওয়ার্ক অর্ডার প্রদান করে। জামিরদিয়া মাস্টারবাড়ির স্কয়ার ফ্যাশানের ওয়ার্ক অর্ডার ছিল, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক (বহিস্কৃত) আলহাজ শহিদুল ইসলামের নামে। এমপি ফখর উদ্দিন আহাম্মদ বাচ্চু কারখানা কর্তৃপর্ক্ষকে বার বার সুপারিশ ও বিভিন্ন হুমকি প্রদান করার ফলে, এমপির অনুকুলে ওয়ার্ক অর্ডার দিতে বাধ্য হন।

মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম জানান, আমি গত ২৫ বছর থেকে অদ্যাবদি যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথেই ব্যবসায় জড়িত ছিলাম, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফখর উদ্দিন আহাম্মদ বাচ্চুর সাথে প্রতিদ্বন্ধীতা করায়, তিনি এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর ক্ষিপ্ত হয়ে, সেসব প্রতিষ্ঠানে কোন ধরণের মালামাল সরবরাহ বা বের করতে চাইলে এমপি বাচ্চুর অনুসারী সন্ত্রাসীরা সংঘবদ্ধ ভাবে মিল গেইটে বাঁধা প্রদান করে আসছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু জানান, আমি এসব ঘটনার সাথে জড়িত নই। তিনি বলেন, কেউ যদি আমার নাম ভাঙ্গিয়ে কারোও ব্যবসায় বাধা ও হুমকি প্রদান করেন, তাহলে এমন কথার স্পষ্ট প্রমান দিতে বলবেন। তিনি আরও বলেন, আমি বা আমার পরিবারের কেউ এসব মিল ফ্যাক্ট্ররীর ঝুটের ব্যবসায় কখনো জড়িত নই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com